৯, ডিসেম্বর, ২০১৯, সোমবার | | ১১ রবিউস সানি ১৪৪১

‘এক পুতের মা রাজত্ব করে আর সাত পুতের মা ভিক্ষা করে’

গ্রামাঞ্চলে একটি প্রবাদ রয়েছে ‘এক পুতের মা রাজত্ব করে আর সাত পুতের মা ভিক্ষা করে’, তেমনি একজন ৭ পুত্রের মা নেত্রকোণার কেন্দুয়া পৌরসভাধীন ৪ নং ওয়ার্ডের হরিয়ামালা গ্রামের জরিনা আক্তার। এক বছর ধরে তিনি ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করলেও বার্ধক্য জনিত কারণে এবং প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ায় এখন আর ভিক্ষা করতে পারছেন না। ফলে মাঝে মধ্যেই তাকে উপোষ থাকতে হচ্ছে। অসহায় অশীতিপর বৃদ্ধা যাকেই পাচ্ছেন তাকে ধরেই হাউমাউ করে কাঁদছেন আর জানাচ্ছেন তার অসহায় জীবন কাহিনী। ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী জরিনা আক্তারের বয়স ৭১ হলেও বাস্তবে আরো বেশী হবে বলে গ্রামবাসীর ধারনা। কে এই সাত ছেলের মা ভিক্ষুক জরিনা? তা জানতে তার বাড়ীতে গেলে উঠানে দেখা মেলে তার। জানতে চাইলে বলতে শুরু করেন, বাবা পাশ্ববর্তী আইথর গ্রামের শরাফত আলীর বড় আদরের কন্যা ছিলেন তিনি। স্বামী মনছুর আলীছিলেন কৃষক সুখের সংসারে কাঁটা হয় প্রতিবেশী আ: কাদিরের সঙ্গে বাড়ীর জমি সংক্রান্ত মামলা। মামলা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে ২০০৭ সনে স্বামী মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর মামলার রায়ে জমি ফেরৎ পেলেও দারিদ্রতার কারণে বিবাদীর কাছেই স্বল্প মূল্যে জমিবিক্রি করে দেয় ছেলেরা। সেই থেকে জরিনা গ্রামে ঘুরে ঘুরে দোকানদারী করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরে প্যারালাইসিসের কারণে পুঁজিহারা হয়ে শয্যাগত হন। এক পর্যায়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে ভিক্ষা করতে শুরু করেন। কিন্তু অসুস্থতা ও বার্ধ্যক্ষের কারণে এখন ভিক্ষাও করতে পারছেন না। কান্না কন্ঠে বলেন, আমি এখন বাঁচবো কি করে? সন্তানদের কথা জানতে চাইলে কপাল দেখিয়ে বলেন, আমার ৭ ছেলে ৩ মেয়ে। সবাই বিয়ে করে যার যার মত সংসার নিয়ে ব্যাস্ত। আমাকে কেউ দেখেনা, খেতেও দেয়না। ছেলেমেয়েদের নাম মনে করে বলেন, সবার বড় ছেলে নূরুল ইসলাম। পরে লক্কুছ মিয়া, আ: ছালাম, ছাইদুল, রফিকুল, রবিকুল, সুনু মিয়া, মেয়ে বেদেনা, সুরাইয়া, ইয়াসমিন। দুই মেয়ে স্বামীর বাড়ীতে এক মেয়ে আমার বাড়ীতে ঘর বেঁধে থাকে। ছেলে সুনু মিয়া ও রফিকুল ঢাকায় রিক্সা চালায়, ছালাম শশুরবাড়ীতে থাকে। সাইদুল গ্রামেই জায়গা কিনে বাড়ী করে। নূরুলইসলামও গ্রামে ভাড়াবাড়িতে থাকে। রবিকুল ভবঘুরে। মায়ের জায়গায় ঘর নির্মাণ করে বাড়িতে থাকে লক্কুছ মিয়া। ছেলে সুনু মিয়াকে বাড়িতে পেয়ে জানতে চাইলে সুনু মিয়া জানান, মা বয়স্ক ভাতা পায়। নিজেরাই চলতে পারিনা। তাছাড়া মা খুব খারাপ মহিলা। ছেলে-বউদের সঙ্গে অকারণে ঝগড়া করে। এসময় সুনু মিয়ার স্ত্রীসহ আরো ২/৩ ছেলে বউ এসে শাশুড়ীকে গালাগাল করতে থাকে। এ বিষয়ে সংশিষ্ট ওর্য়াডের সাবেক কমিশনার আরিফুল ইসলাম সেলিম, গ্রামের শাহ মোহাম্মদ বাচ্চু ফকির, হাবিবুর রহমানসহ অনেকেই জানান, ওই বৃদ্ধা মহিলা অনেক কষ্টে আছেন। ছেলেরা মাকে খাবার তো দেয়-ই না- উপরন্ত ছেলে ও বউয়েরা ওই মহিলাকে মারধর করে। তাকে উপোষও থাকতে হয়। আমরা বহু সালিশ দরবার করেছি। কুলাঙ্গার ছেলেরা ও তাদের বউয়েরা আমাদের কোন কথাই শোনেনা। তাদের উদ্দেশ্য, মায়ের নামে থাকা সাড়ে ৮ শতাংশ ভূমি বিক্রি করে নিয়ে যাওয়া। আমরা চাই প্রশাসনের হস্তক্ষেপে যেন বৃদ্ধ মহিলা জরিনা আক্তারের একটা ব্যবস্থা হয়।