৭, ডিসেম্বর, ২০১৯, শনিবার | | ৯ রবিউস সানি ১৪৪১

মানুষের সুখ শান্তিও কেড়ে নিচ্ছে সরকার : মির্জা ফখরুল

আপডেট: December 4, 2019

মানুষের সুখ শান্তিও কেড়ে নিচ্ছে সরকার : মির্জা ফখরুল

দেশে অব্যাহতভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য সরকারকে দায়ী করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, সরকার ও ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছার ওপরই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য নির্ভরশীল। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে ক্ষমতাসীন দলের ব্যবসায়ী জোটই দায়ী। সুতরাং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সামাজিক নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে। দ্রব্যমূল্যসহ জীবনযাত্রাকে সহনীয় মাত্রায় রাখতে হলে একটি জবাবদিহিতামূলক সরকার গড়ে তুলতে হবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষার জন্য অবিলম্বে এই অবৈধ ভোটারবিহীন তথাকথিত নির্বাচনের ফলাফল বাতিল ও নিরপেক্ষ সরকার এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায় শুধু দ্রব্যমূল্যভিত্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাই নয় জাতির গোটা ভবিষ্যৎ আরো অসহনীয় ও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। কেননা ইতোমধ্যে পেঁয়াজের কৃত্রিম সঙ্কটকে পুঁজি করে অতি মুনাফালোভী সরকারদলীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, আমদানিকারক, আড়তদার, মজুদদার, খুচরা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভোক্তাদের পকেট থেকে হাতিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা। গতকাল মঙ্গলবার সকালে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, মীর সরফত আলী সপু, অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ, মো: মুনির হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, মানুষের ভোটাধিকার ও নাগরিক মর্যাদা কেড়ে নেয়ার পর তাদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-শান্তিও একের পর এক কেড়ে নিচ্ছে ভোটারবিহীন এই গণবিরোধী সরকার। ২৯ ডিসেম্বরের প্রহসনমূলক ‘মিডনাইট নির্বাচন’’ পরবর্তী রাজনৈতিক সঙ্কট, পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির চিত্র এবং গুম, খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় গোটা রাষ্ট্র যখন গণতন্ত্র ও আইনবিহীন তখন তার স্বাভাবিক ধারায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার নিয়ন্ত্রণেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে। যার সর্বশেষ প্রমাণ পেঁয়াজ, চাল, ডাল, তেল, লবণ থেকে শুরু করে সবকিছু অসহনীয় মূল্যবৃদ্ধি। বর্তমান সরকার একদিকে মুক্তবাজারের দর্শনে বিশ্বাসী, অন্য দিকে নিজস্ব দলীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় আগ্রহী। সরকারের দুর্নীতি, টাকা পাচার, লুটপাটের মাধ্যমে পাহাড় সমান সম্পদ অর্জনের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বি হয়েছে। কারণ দ্রব্যমূল্যের ভয়াবহতার ন্যূনতম আঁচ তাদের ওপর লাগে না।
তিনি বলেন, দেশের খেটে খাওয়া মানুষের শ্রমে, ঘামে অর্জিত ট্যাক্সের টাকা শতকরা ৩৬ ভাগই পাচার হয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। দলীয় ব্যবসায়ীদের তৈরি জোট ভাঙতে না পারলে, টিসিবিকে শক্তিশালী করতে না পারলে, দলীয় লোকজন দিয়ে পরিবহনের চাঁদাবাজি বন্ধ এবং মধ্যস্বত্ব ব্যবস্থা বন্ধ করতে না পারলে দ্রব্যমূল্য হ্রাস করা সম্ভব হবে না। বক্তৃতা-বিবৃতি ও লোক দেখানো ভণ্ডামীতে আর যাই হোক দ্রব্যমূল্য হ্রাস বা অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যারা দ্রব্যমূল্য বাড়াচ্ছে তারা সবাই আওয়ামী লীগের লোক। কোনো ঘাটতি না থাকলেও সরকারের ব্যর্থতার কারণেই মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেÑ এটাই জনগণের দাবি। কিন্তু জনগণের প্রতি মিডনাইট সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। কারণ তাদের সরকার গঠনের জন্য জনগণের ভোটের কোনো দরকার হয়নি এবং আগামীতেও জনগণের ভোটের কোনো দরকার তাদের নেই। তারা নির্বাচনের খোলসে দলবাজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ঘাড়ে ভর করে গায়ের জোরে আবার সরকার গঠন করতে চায়। তবে জনগণ তাদের এই ষড়যন্ত্র আর বরদাশত করবে না।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সর্বশেষ ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর এবং বর্তমান সরকারের আমলে গত ১ ডিসেম্বর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের সময় ২০০৬ সালে চাল, ডাল, তেল, আটা, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম ছিল সহনীয়। ওই আমল এবং বর্তমানের দ্রব্যমূল্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত ১৩ বছরে জিনিসপত্রের মূল্য গড় হিসাবে বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, অনেক জিনিসের মূল্য বেড়েছে তিন গুণ। অথচ অ্যাসেনসিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট অনুযায়ী সরকার ১৭টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। এই সরকারের প্রতিশ্রুত ১০ টাকার চাল আমজনতা খেয়েছে ৭০ টাকায়!
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে জনজীবনের দুর্বিষহ চিত্র তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ কতটা অসহায় তার একটা উদাহরণই তাদের মানবেতর জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা দিতে সক্ষম। গ্রাম থেকে আসা এক শিক্ষার্থীর সহজ স্বীকারোক্তি হচ্ছে এ রকমÑ ‘বাজারে সবজির মূল্য বৃদ্ধির ফলে সবজি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ বাজারে এমন কোনো সবজি নাই যার মূল্য ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে। এমন কি পেঁয়াজ পাতার দামও হচ্ছে কেজি ১০০ টাকা। প্রশ্ন ছিল তাহলে তার খাদ্য তালিকায় কী থাকে? উত্তর ছিল ডিম এবং যথারীতি এক বাটি পানি সমৃদ্ধ ডাল। তাও একটা ডিম দুইজনে ভাগ করে খায়। দ্রব্যমূল্যের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে এটাই হচ্ছে বাস্তব চিত্র। আর এই হচ্ছে আমাদের ভোটারবিহীন সরকারের দেশকে মধ্য আয়ে পরিণত করার অসহনীয় ফলাফল।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে দলের বড় কোনো কর্মসূচি আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সারা দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে আমরা কর্মসূচি নিয়েছি, কর্মসূচি হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মির্জা ফখরুল বলেন, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে গণশুনানিতে আমাদের প্রতিনিধি গিয়েছিল, সেখানে দলের বক্তব্য দেয়া হয়েছে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে অতীতে আমরা কর্মসূচি নিয়েছি। ফের মূল্য বৃদ্ধি হলে আমরা অবশ্যই কর্মসূচি নেবো। বিদ্যুতের দাম, পেঁয়াজের দাম শুধু বিএনপিকে প্রভাবিত করে না। জনগণকেও অ্যাফেক্ট করে। এ জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং এই যে দানব তাদেরকে অপসারণ করতে হবে।