৭, ডিসেম্বর, ২০১৯, শনিবার | | ৯ রবিউস সানি ১৪৪১

তোমাকে ভালোবাসি হে নবী (সা.)

আপডেট: December 3, 2019

তোমাকে ভালোবাসি হে নবী (সা.)

আমাদের হৃদয়ের বাদশা ও অধিপতি হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন বিশ্বমানবতার একমাত্র মুক্তির দূত।
তিনিই পৃথিবীকে শান্তির বাণী শুনিয়েছেন, অশান্তি দূরিকরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। তার কাজ ও পদ্ধতির বদৌলতে পৃথিবীর তাবৎ প্রাণীকুল শান্তিসুখ পায়। তিনি শুধু মুসলমানদের মুক্তির কথা ভাবেননি। শুধুমাত্র মানুষের মুক্তির কথা ভাবেননি, ভেবেছেন পুরোজগত নিয়ে, পুরো সৃষ্টিজীব নিয়ে। তাঁর জয়োগান গেয়েছেন মুসলিম, ইহুদি, খৃস্টান, হিন্দু ,পৌত্তলিকসহ আরো যত বিভাজনের যতরঙের যতপথের যতমতের মানুষ আছে। মদিনার চারিধারে যখন ‘তলাআল বাদরু আলাইনা’ এর সুর মূর্ছনা উঠেছে তখন মদিনাবাসী তাকে তেমনভাবে চিনেনি। যদি চিনতো শুধু গান নয়, নিজেরদের জীবন তার পায়ের তলায় সঁপে দিত। পরবর্তীতে তাই দেখা গেছে।

ভয়াবহ দুশ্চরিত্রে সমাজ যখন বেধড়ক খারাপ। অসহায়ত্ব নিয়ে যখন মানুষ মানুষকে নিয়ে পশুত্বে মেতে ছিল, যখন জীবন্ত মানুষকে কবর দিয়ে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলতো তখনই আসেন তিনি (সা.)। মানুষকে শুনান সুখের বাণী। মানুষ হওয়ার কথা। তিনি জীবনপণ চেষ্টা করে পৃথিবীর বুকে শান্তির এনেছেন। মহান আল্লাহও তাকে প্রেরণ করেছেন পৃথিবীর জন্য রহমত স্বরূপ। ঘোষণা করেন- ‘আমি আপনাকে পৃথিবীর জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি’। (সূরা হাজ : আয়াত নম্বর ১০৭)।

শুধু এতোটুকু নয়; তার চরিত্রমাধুর্যে অবাক ছিল পৃথিবীবাসী। যদি সেই অবাক করা কোনো ঘটনার বর্ণনা দিতে হয়, বর্ণনা দিতে হবে সেই বুড়ির কাহিনী। যে বুড়ি প্রতিদিন রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে রাখতো নবীজির (সা.) পায়ে বিঁধবে বলে। হঠাৎ একদিন নবীজি (সা.) দেখলেন কাঁটা বিছানো নেই। তিনি ভাবলেন হয়তো বুড়ি অসুস্থ। তাই তিনি খোঁজ খবর নিলেন। নবীজি (সা.) এর এমন আচরণে অবাক হলেন বুড়ি ও বুড়ির প্রতিবেশী ইহুদি মহিলারা। তাদের ধারণা পরিবর্তন হলো; এমন ভালো মানুষ কখনো মিথ্যা নবীর দাবিদার হতে পারে না। তিনি সত্য নবী। আল্লাহর প্রেরিত নবী। তখন থেকে বুড়ি আর নবীকে গালি নয় দেয় শুধু ভালোবাসা অভিরাম।

রাসূলের (সা.) সেই চরিত্র মাধুর্য নিয়ে আল্লাহর পাক ঘোষণা। দেখুন কতটা বাঙময়। ‘নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রস্বর্ণের অধিকারী’। (সূরাতুল কালাম ০৫)।

আরো স্পষ্ট বর্ণনা রাসূল (সা.) নিজেই দিচ্ছেন যে- ‘আমি তো প্রেরিত হয়েছি একারণেই যে, আমি পৃথিবীর সকল ভালো চরিত্রগুলোর পূর্ণতা দান করব (বায়হাকি)। অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘হজরত কাকা ইবনে হাকিম আবি সাহেল থেকে আবু হুরায়রার সূত্রে বর্ণনা করেন; আমি কেবল সচ্চরিত্রকে পূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।’

মানুষের চরিত্র ঈমানের চেয়ে দামি। কেননা ঈমানের স্থান কলব। প্রথম দেখাই মানুষ তার ঈমান দেখতে পায় না, দেখতে পায় চরিত্র। মানুষ কিন্তু তার ঈমানের কারণে মিশে না, মিশে চরিত্র মাধুর্যে। আর এ সুন্দর ও মধুময় চরিত্র মানুষকে ধাবিত করে ঈমানের দিকে। রাসূলুল্লাহ এর আচরণে কত যে, মানুষ মুসলমান হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তার চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার জন্য স্বয়ং আল্লাহর নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু নির্দেশ নয়, এভাবে বারবার হুকুমও দেয়া হয়েছে। ঘোষণা হচ্ছে-‘বস্তুত রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ চরিত্র- এমন ব্যক্তির জন্য যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের দিনকে বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে’ (সূরা আহযাব : ২১)।

এই আয়াত থেকে কী বুঝলাম? আল্লাহ কী আমাদের লক্ষ করে এই কথা বলেছেন যে, তোমাদের জন্য রাসূলের জীবনীতে ঈমান রয়েছে? রাসূলের জীবনীতে নামাজ রয়েছে? রাসূলের জীবনীতে রোজা রয়েছে? না, এরকম কিছুই বলেনি। কী বলেছেন? বলেছেন- তোমাদের জন্য রাসূলের জীবনীতে উত্তম আখলাক ও আদর্শ চরিত্র রয়েছে। তার সুমহান আদর্শের বদৌলতে আরবের মতো বর্বর একজন অশিক্ষিত জাতি আচার আচরণ সভ্যতা ও কৃষ্টি কালচারে সোনার মানুষের পরিণত হয়েছেন।

সুতরাং তার মায়াময় ও যাদুময় চরিত্রের আকর্ষণের পুরো পৃথিবী মোহিত হয়েছে, হয়েছে মুগ্ধ। শুধু মুসলমানেরা নয়, তার চরিত্রের ভুয়সী প্রশংসা করেছেন ভিন্নধর্মাবলম্বীরাও। পৃথিবী বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এইচ কে হার্ট তার একশত মনীষী বইয়ে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তিকে স্থান দিয়েছেন তিনি হলেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এমন একজন ব্যক্তিকে গালি দেয়া কখনো শোভা পায় না। তিনি মাবনবতার জয়যাত্রায় যে ভূমিকা রেখেছেন পৃথিবীর আর কোনো মানুষ প্রতিষ্ঠান মতবাদ জাতি গোষ্ঠী মতাদর্শ রাখতে পারেনি।

তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন প্রচন্ড, বড়দের সম্মান করতেন সীমাহীন। স্ত্রীর কাছে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী, বাবা হিসেবে তার তুলনারহিত, শিক্ষক হিসেবে জগতের সবচে’ দামি ও আদর্শবান শিক্ষক, অন্যায় ও মিথ্যার প্রতিবাদী হিসেবে আপোষহীন সংগ্রামী। এভাবে তিনি সকল ক্ষেত্রে উত্তমতার চরিত্র প্রকাশ করেছেন এবং জগতকে শিক্ষা দিয়েছেন।

এমন একজন তুলনাহীন ব্যক্তিত্বকে গালি দেয়া যায় না। দিতে হয় ভালোবাসা অভিরাম। তাকে গালি দিলে মানতবতা অপমানবোধ করে। তাকে গালি দিলে মনুষ্যত্ববোধ চিৎকার করে। তাই আমাদের সকলের উচিৎ তাকে গালি নয় দিতে হবে ভালোবাসা অবভিরাম।