৭, ডিসেম্বর, ২০১৯, শনিবার | | ৯ রবিউস সানি ১৪৪১

ঘুমে ছিলেন দুই চালকই, ভাঙে পরপর তিনটি সিগন্যাল!

আপডেট: November 13, 2019

ঘুমে ছিলেন দুই চালকই, ভাঙে পরপর তিনটি সিগন্যাল!

রাত ২টা ৪৮ মিনিটে মন্দবাগ স্টেশনের এক নম্বর লাইনে প্রবেশ করে উদয়ন এক্সপ্রেস। একই লাইনে বিপরীত দিক থেকে আসছিল তূর্ণা নিশীথা। ট্রেন দুটির ক্রসিং হওয়ার কথা ছিল মন্দবাগ স্টেশনে। এ জন্য উদয়ন এক্সপ্রেসকে এক নম্বর লাইন থেকে ডান পাশের লুপ লাইনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, যেন তূর্ণা নিশীথা এক নম্বর লাইন দিয়ে স্টেশন পার হতে পারে।

আরও সিদ্ধান্ত ছিল ‘উদয়ন এক্সপ্রেস’ স্টেশনে প্রবেশের আগ পর্যন্ত মন্দবাগ স্টেশনের আউটারে থাকবে ‘তূর্ণা-নিশীথা’। তবে সেই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে দেয়া তিনটি সিগন্যাল অমান্য করে ৬০-৭০ কিলোমিটার বেগে উদয়নে আঘাত করে তূর্ণা-নিশীথা।

মন্দবাগ রেল স্টেশনে সোমবার দিনগত রাত ৩টায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পেছনের কথা জানাতে গিয়ে এমন তথ্য জানান বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মিয়া জাহান।

গণমাধ্যমের কাছে তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা অভিমুখী ‘তূর্ণা নিশীথা’র চালক ও তার সহকারীর দায়িত্বহীনতার কারণে এ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আসলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ঘটনার পর থেকে তূর্ণা নিশীথার লোকোমাস্টার তাছের উদ্দিন, সহকারী লোকোমাস্টার অপু দে ও ওয়ার্কিং গার্ড আব্দুর রহমান পলাতক আছেন। ইতোমধ্যে তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে।’

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এক কর্মকর্তা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়াদের বরাত দিয়ে জানান, দুর্ঘটনার সময় ‘তূর্ণা নিশীথা’ ছিল অটো ব্রেকে। মূলত বিরতিহীন ট্রেন হওয়ায় অটো ব্রেকে রেখেই লোকোমাস্টার ও সহকারী লোকোমাস্টার হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তূর্ণাকে আউটারে থাকতে তিনটি সিগন্যাল দেয়া হয়েছিল মন্দবাগ রেল স্টেশন থেকে। দুইজন চালক একটি সিগন্যালও কেন দেখলো না? এর বাইরে আউটার, হোম, স্টার্টারসহ বেশ কিছু কারিগরি প্রক্রিয়া আছে। এসবের কোনোটাতেই তূর্ণা নিশীথার চালকরা সারা দেয়নি। প্রায় ৬০-৭০ কিলোমিটার বেগে উদয়ন এক্সপ্রেসকে আঘাত করে তূর্ণা নিশীথা।

একাধিক কর্মকর্তার তথ্যমতে, দুই মিনিট অপেক্ষা করলেও এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়ানো যেত ট্রেনটির ১৬টি বগির মধ্যে ৯টি ততক্ষণে লুপ লাইনে ঢুকে গেছে। এ সময় ১০ নম্বর বগিতে গিয়ে আঘাত করে তূর্ণা নিশীথা। এতে করে লাইনচ্যুত হয়ে যায় ১০, ১১ ও ১২ নম্বর বগি। এগুলোর মধ্যে ১০ নম্বর বগিটি আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়; দুমড়ে-মুচড়ে যায় ১১ নম্বর বগিটি। একে রেলের ভাষায় বলে সাইড কল্যুশন।

রেলওয়ে স্টেশন, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম ছেড়ে আসা তূর্ণা নিশীথা মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশের আগেই স্টেশনমাস্টার আউটারে থামার সংকেত দেন। অন্যদিকে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেসকে কসবা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশকালে মেইন লাইন ছেড়ে ১ নম্বর লাইনে আসার সংকেত দেওয়া হয়। ওই ট্রেনের চালক ১ নম্বর লাইনে প্রবেশ করার সময় ছয়টি বগি প্রধান লাইনে থাকতেই অপরদিক থেকে আসা তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের চালক সিগন্যাল (সংকেত) অমান্য করে দ্রুতগতিতে ঢুকে পড়ে। এ সময় উদয়নের মাঝামাঝি তিনটি বগির সঙ্গে তূর্ণা নিশীথার ইঞ্জিনের সংঘর্ষ হয়।

মন্দবাগ স্টেশনের মাস্টার জাকির হোসেন চৌধুরী জানান, তূর্ণার চালক তথা লোকোমাস্টারকে ট্রেন থামানোর জন্য আউটার ও হোম দুই স্থানেই লালবাতি জ্বালিয়ে সংকেত দেওয়া হয়েছিল। উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনটি এক নম্বর লাইনে ঢুকছিল। তূর্ণা নিশীথাকে আউটারে থাকার সিগন্যাল দেওয়া হয়। কিন্ত চালক ট্রেন দাঁড় না করিয়ে মূল লাইনে ঢুকে পড়ার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটে।