১৮, নভেম্বর, ২০১৯, সোমবার | | ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

গোপালগঞ্জে আ.লীগে অনুপ্রবেশকারীদের শীর্ষে মুকসুদপুর! : সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক দু’জনই অনুপ্রবেশকারী

আপডেট: November 9, 2019

গোপালগঞ্জে আ.লীগে অনুপ্রবেশকারীদের শীর্ষে মুকসুদপুর! : সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক দু’জনই অনুপ্রবেশকারী

এম শিমুল খান, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জ জেলায় আ.লীগে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকার শীর্ষে রয়েছে মুকসুদপুর উপজেলা। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে মুকসুদপুর উপজেলায়। মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের বর্তমান সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকদের বিরুদ্ধে আ,লীগে অনুপ্রবেশকারী হিসাবে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক।

প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তৈরিকৃত এক হাজার পাঁচশত জনের আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা প্রকাশ করে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। তা নিয়ে প্রতিটি জেলায় ও উপজেলায় ব্যবস্থা গ্রহণ ও তারা যেন ২০১৯ সালের আওয়ামীলীগের কোনো ধরনের সাংগঠনিক পদে আসতে না পারে সেই ধরনের দিক নির্দেশনা রয়েছে কেন্দ্র থেকে।

গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলায় কোনো অনুপ্রবেশকারী নেই প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব তালিকায়। মুকসুদপুর উপজেলার তৃনমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মতে, আওয়ামীলীগের নেতারা তাদের নিজস্ব বলয় তৈরি করতে এ অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। এখানে অনুপ্রবেশ করাতে নিজস্ব লাভকে বেশি প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বি ত হচ্ছে তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতাকর্মীরা। তাদের কারণে তৃণমূল থেকে উঠে আসা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা পদপিষ্ট হচ্ছে দিনে দিনে।
উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, বিএনপি নেতা কে এম ওবায়দুর রহমানের হাত ধরে দলে প্রবেশ করেন ও এক সময়ের বিএনপির ডোনার হিসেবে পরিচিত এবং বিএনপির মুকসুদপুর উপজেলার সাবেক সভাপতি মো: আতিয়ার রহমান মিয়া। ১৯৭৭ সালে তিনি মুকসুদপুর থানা বিএনপির সভাপতি ছিলেন।

এরপর ১৯৭৯ সালে বিএনপির দলীয় প্রতিক ধানের শীষ প্রতিক নিয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। ১৯৮১ সালে এরশাদ ক্ষমতায় আসার পরে তিনি যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে তিনি মুকসুদপুর উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালে তিনি জাতীয় পার্টি থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে গনআন্দোলনের সময় কিছু দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে তিনি আতিয়ার হোসেন উকিলের হাত ধরে আবার প্রবেশ করেন আওয়ামীলীগে। আওয়ামীলীগের বিভিন্ন মিশিল, মিটিং এ অংশনেন গড়ে তুলেন নিজস্ব বলয়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে তিনি মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

পরবর্তীতে আওয়ামীলীগের দলীয় প্রতিকে নির্বাচন করে মুকসুদপুর পৌরসভার মেয়র হিসাবে নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র হিসাবে দ্বায়িত্বে রয়েছেন। পৌর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুদকে কয়েকটি মামলা হয়। বর্তমানে ওই মামলাগুলি তদন্তাধীন রয়েছে। তা ছাড়াও তার দুই ছেলের বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যাপক অভিযোগ। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে পৌরসভা থেকে ঠিকাদারী কাজ নেওয়া, ইজিবাইক স্টান্ড থেকে চাঁদা তোলা, নিজস্ব বাহিনী তৈরী করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র মো: আতিয়ার রহমান মিয়ার দুই ছেলের বিরুদ্ধে। বাবা মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরে তার দুই ছেলে রানা মিয়া ও রনি মিয়া কোটি টাকার কাছাকাছি পৌরসভার কাজ করেছেন বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী।

আওয়ামীলীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র মো: আতিয়ার রহমান মিয়ার দুই ছেলে রানা মিয়া ও রনি মিয়ার ব্যাপক অপকর্মের কারনে আতিয়ার মিয়ার পতনকে আরো ত্বরান্মিত করেছে বলে অনেকে মন্তব্য করেন। মুুকসুদপুর পৌরসভার মেয়র আতিয়ার রহমান মিয়ার বিরুদ্ধে দুদকে একাধিক দুর্নীতি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দায়েরের পর বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা বিপুল অংকের টাকা আতিয়ার মিয়া সরিয়ে নিয়েছে বলে ব্যাংক সুত্রে জানা গেছে।

দুদকে করা অভিযোগ সুত্রে জানা যায়, আওয়ামীলীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র মো: আতিয়ার রহমান মিয়ার রয়েছে তিনটি গাড়ি, মৌজা ও দাগ নম্বরসহ অবৈধ ভাবে সরকারি জমি দখল, অগ্রনী ব্যাংক, সোনালি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও এশিয়া ব্যাংক সমুহের হিসাব নম্বরসহ উল্লেখ করা হয়েছে ওই আবেদনে। মধুমতি ব্যাংকেও তার একটি ডিপোজিট একাউন্ট রয়েছে বলে জানান একজন অভিযোগকারি। ঢাকায় থাকা তার ২য় স্ত্রী হাসিনা বানুর নামে ঢাকার রিং রোডের এশিয়া ব্যাংক শাখায় বিপুল পরিমান টাকার কথাও অভিযোগে বলা হয়েছে। থানার একটি বাথরুম নির্মানে ব্যায় দেখানো হয়েছে ৫,১০.৩০০ টাকা। তার প্রিয় লোক কাইয়ুম শেখের নামে ২৮মে দুইলক্ষ সাতাশ হাজার ষোল টাকার একটি চেক দিয়ে চেকে কাইয়ুমের স্বাক্ষর ছাড়াই উক্ত টাকা উঠিয়ে মেয়র আতিয়ার রহমান আত্মসাৎ করে। প্রায় ৪৪ কোটি টাকায় পৌরসভার পানির লাইনের কাজ অতি নি¤œমানের মালামাল দিয়ে উক্ত কাইয়ুমের মাধ্যমে করাচ্ছে মেয়র নিজেই। জনগনকে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

এছাড়াও আতিয়ার মিয়া মেয়র নির্বাচিত হয়েই সে তার ঘনিষ্ট ১০/১২জনকে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি করে চাকরি দিয়েছে। এ নিয়োগে তার কোটি টাকার উপরে আয় হয়েছে বলে অনেকের ধারনা। এদের প্রতিজনের নিকট থেকে তিনি ৮ লক্ষ হইতে ১৫ লক্ষ টাকা নিয়েছেন। তার নিজের এবং পরিবারের আরো কয়েকজনের চরিত্র এতই খারাপ যে মুকসুদপুরের মানুষ তাদের ডন্ট মাইন্ড ফ্যামিলি আখ্যা দিয়েছে।

আতিয়ার মিয়া প্রেজেন্ট গভঃ পার্টি (পিজিপি) নেতা হিসাবেও তিনি পরিচিত। জিয়াউর রহমানের আমলে থানার বিএনপি সভাপতি হিসাবে সে এ আসন থেকে সংসদ নির্বাচন করে। এরশাদের আমলে সে ছিল জাতীয় পার্টির থানা কমিটির সম্পাদক। বর্তমানে সে আওয়ামীলীগের থানা কমিটির সভাপতি। এমপি ফারুক খানের বাড়িতে আওয়ামীলীগের কর্মী সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আতিয়ার মিয়া জানায় বিভিন্ন দল থেকে আসা কয়েকজন তার বিরুদ্ধে দুদকে প্রায় ৫০টি মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে। তার এ বক্তব্যের পরে এমপি সাহেব বা কোন নেতা কর্মী কোন বক্তব্য বা মন্তব্য করেনি। অনেকের ধারনা এতো বিশাল অপকর্মের কারনে আতিয়ার মিয়ার জনপ্রিয়তা শুন্যের কোঠায় নেমে গেছে।

মুকসুদপুর পৌরসভার কাউন্সিলররা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও মেয়রের বিরুদ্ধে সকলেরই ক্ষোভ রয়েছে। তার দুই ছেলে রানা মিয়া ও রনি মিয়ার ব্যাপক অপকর্মের কারনে আতিয়ার মিয়ার পতনকে আরো ত্বরান্মিত করেছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছে। আতিয়ার মিয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক লেখালেখি হচ্ছে। জানা গেছে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রের নেতাদের বিপুল অংকের টাকা দিয়ে দুদকের মামলা হইতে খালাস পাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।

আগামী উপজেলা কাউন্সিলে তিনি উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হলে আওয়ামীলীগের অনেক ত্যাগি নেতা-কর্মী আওয়ামীলীগ থেকে সরে যাবেন বলে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়।

এ ব্যাপারে মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র মো: আতিয়ার রহমান মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল ০৭১৭২-৫৭৫০৭৯ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি আওয়ামীলীগে কোন অনুপ্রবেশকারী না। উপজেলা আওয়ামীলীগে অনুপ্রবেশকারী হচ্ছে মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক রবিউল আলম সিকদার। তিনি এক সময় জাতীয় পার্টি করতেন পরবর্তীতে তিনি আওয়ামীলীগে যোগদেন।

তিনি আরো বলেন, মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক রবিউল আলম সিকদার জাতীয় পার্টিতে থাকাকালীন সময়ে আমাদের সংসদ সদস্য ফারুক খানের উপর হামলা চালায়। তিনি বহু অপকর্মর হোতা।

মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগে অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক রবিউল আলম সিকদার। তিনি এক সময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও পরবর্তীতে তিনি এরশাদের ক্ষমতা আমলে জাতীয় পার্টিতে যোগদেন। জাতীয় পার্টিতে থাকাকালীন সময়ে তিনি গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কর্ণেল (অব:) ফারুক খানের উপর হামলা করেন। তৎকালীন সময়ে আওয়ামীলীগের বিভিন্ন মিছিল, মিটিং এ হামলা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

জাতীয় পার্টি থেকে আসা আ.লীগে অনুপ্রবেশকারী মো: রবিউল আলম সিকদার মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মুকসুদপুর উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হয়ে বিদ্যালয় কমিটি তার নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালনা করেন। তিনি উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তার ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে চাকুরীতে নিয়োগ দেয়া, টেন্ডারের কাজ ভাগাভাগি করা, প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলী বাণিজ্য, টেন্ডার বিহীন কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান থেকে উৎকোচ গ্রহনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তিনি জাতীয় পার্টির সময়ে নিজ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তৎকালীন সময়ে আওয়ামীলীগের তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীকে জেল খাটিয়েছেন বলে জানা যায়। এছাড়াও ওই সময় কেউ আওয়ামীলীগের পরিচয়ে তার কাছে কোন কাজে গেলে তিনি তাদের গালমন্দ করে বেরিয়ে দিতেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসলে ভোল পাল্টে রবিউল আলম সিকদার আওয়ামীলীগের নেতা বনে যান। বিএনপি আমলে তাকে অনেকেই তৎকালীন জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক এম এইচ খানের সাথে দেখতে পায়। সে সময়ে তিনি এম এইচ খানের কাছ থেকে অনেক কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে মো: রবিউল আলম সিকদারের ব্যবহৃত মোবাইল ০১৭১৮-২৩০১৩০ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ছাত্র জীবন থেকে ছাত্রলীগ করতাম। এরশাদের শাসন আমলে আমি বিপদে পড়ে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেছি। পরবর্তীতে আবার আমি আওয়ামীলীগে যোগ দেই।

তিনি আরো বলেন, আমি আওয়ামীলীগে কোন অনুপ্রবেশকারী না। আওয়ামীলীগে অনুপ্রবেশকারী হচ্ছে আমাদের উপজেলার সভাপতি আতিয়ার মিয়া। তিনি বিএনপির দলীয় প্রতিক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচন করেছেন। আবার জাতীয় পার্টিতে থাকাকালীন সময়ে তিনি উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারন সম্পাদকও ছিলেন।
মুকসুদপুর উপজেলা তৃণমূল আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর এ অনুপ্রবশকারীদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে আরো বলেছেন, এ অভিযান যেন আরো বেগবান যেন হয়, থমকে যেন না দাঁড়ায়।