১৪, নভেম্বর, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

স্বার্থপরতার ইতিবৃত্ত -মেহেদী রাশেদ

আপডেট: November 6, 2019

স্বার্থপরতার ইতিবৃত্ত -মেহেদী রাশেদ

স্বার্থপরতা কি কোন দোষ, নাকি গুণ? মূলতঃ এটা কোন দোষও না কিংবা কোন গুণও না। এটা একটা বৈশিষ্ট্য, প্রাণীজ বৈশিষ্ট্য। আণবিক শক্তি কাজে লাগিয়ে যেমন বোমা তৈরি হয়, আবার তা দিয়ে হিরোশিমা কিংবা নাগাসাকি গুড়িয়ে দেয়া যায়, তেমনি সেই একই আণবিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় নিউক্লিয়ার মেডিসিন, যা দিয়ে বাঁচানো যেতে পারে হাজার হাজার মানুষের জীবন। স্থান-কাল-পাত্র ও মাত্রা ভেদে স্বার্থপরতাও তেমনি হয়ে যায় দোষ কিংবা গুণের প্রতীক ।

স্বার্থপরতা একটা মানবীয় মৌলিকতা যা অস্বীকার করার উপায় নেই আমাদের । ইগো, সেন্স অব আই, আমিত্ব, অহম ইত্যাদি একই মানবীয় বৈশিষ্ট্যের ভিন্ন ভিন্ন নাম। তাকে যে নামেই ডাকা হোক, এর অস্তিত্ব ছাড়া মানুষের জাগতিক অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। সেই অস্তিত্বের একটা বিশেষ বহিঃপ্রকাশের নাম স্বার্থপরতা। এই বৈশিষ্ট্যটা তার মূল অস্তিত্বেরই অংশ। ইগো দিয়ে সে নিজেকে চেনে, নিজের সম্পর্কে ধারণা নেয়, কোন কিছু করার তাগিদ অনুভব করে, নিজের জন্যে করে।

স্বার্থপরতা শব্দগতভাবে নেতিবাচক। স্বার্থপরতার বশবর্তী হয়ে মানুষ বিরামহীনভাবে নিজের জন্যে ক্রমাগত করতে থাকে । নিজের জন্যে করায় দোষের কিছু নেই। তবে কতক্ষণ, কতদূর পর্যন্ত নিজের জন্যে করা যায়, সেখানেই রয়েছে মাত্রার বিষয়। অমর হওয়ার অদম্য ইচ্ছাও একটা বড় স্বার্থ। সেই স্বার্থ অর্জনে তার যা যা করা দরকার তা সে করে। তখন তাকে আপাতদৃষ্টিতে নিঃস্বার্থ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সে তা নয়। এই বড় স্বার্থপরতা হাসিলের ভিতর দিয়ে মানবতা উপকৃত হয়, অগুনিত জীবন স্বস্তি পায়। সুতারং স্বার্থপরতা মানেই খারাপ তা নয়। ব্যক্তির স্বার্থ যত বড় হতে থাকে, যত মহৎ হতে থাকে তার ব্যক্তিগত বৈষয়ীক অর্জন ততো কমতে থাকে, তবে কাঙ্খিত অমরতা প্রাপ্তির ঘরে জমতে থাকে ভালোবাসার পুঁজি। স্বার্থের বৃত্ত থেকে তাই কারো মুক্তি নেই। ডিএনএ ছাড়া যেমন জীন হয় না, স্বার্থ ছাড়া তেমনি জীবনও হয় না।

বড় স্বার্থের বিমূর্ত পুঁজির নেশায় বিভোর হয়ে আজকের দিনে কতজন মহতপ্রাণ কর্মসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়েন? বর্তমানে দানবীরেরা হাতেমতাঈ হন না, হন বাফেট, বিল গেটস। আয় থেকে বিবেকের দায় শোধে তারা সিদ্ধ হস্ত। মানবিক স্বার্থপরতাকে একটা দেহে বন্দী করে রাখলে মানবিক সত্ত্বার একটা বড় অংশের কবর রচিত হয়। তাই এই স্বার্থপরতাকে রূপান্তরের মাধ্যমে ব্যক্তিদেহ থেকে পরিবারে, পরিবার থেকে সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে, রাষ্ট্র থেকে মহাদেশে, মহাদেশ থেকে পুরা পৃথীবিতে প্রতিস্থাপিত করতে হয়। স্বার্থের এই রূপান্তরের ফলে ঘটে যায় ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের সৃষ্টি হয়। এই ভাবে ব্যক্তিস্বার্থের সংকীর্ণতার প্রত্যাখানের ভিতর দিয়ে প্রতিষ্ঠা পায় বৈশ্বিক স্বার্থ বা গ্লোবাল ইন্টারেস্ট।

সবুজ রঙের এই গ্রহটায় যেদিন প্রথম একফোঁটা আঠালো এমিনো এসিডের জন্ম হয়েছিল, সেদিন থেকেই তার সাথে মনেপ্রাণে জড়িয়ে ছিল স্বার্থপরতার গ্লানি। বিষে যেমন হয় বিষক্ষয়, ঠিক তেমনি স্বার্থপরতা দিয়েই করা যায় স্বার্থপরতার গ্লানি মোচন। মানুষকে নীচ করে, হীন করে সাধ্য কার? আশাবাদী আমরা, একদিন সে ঠিকই স্বার্থপরতার ম্লানতা থেকে মুক্ত হবে, একপৃথিবী গড়ার দৃষ্টান্ত তৈরি করে মহিমান্বিত হবে ধনে, মনে, হৃদয়ে ও আত্মায়। বলে রাখা ভালো যারা মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার স্বার্থে কিংবা অমরত্বের স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করেন তারাই বেশি প্রতারিত ও আঘাত পায়। এরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব৷ এরাই পৃথিবীকে বাচিয়ে রেখেছে।

পৃথিবীতে নিজে ভালো থাকতে চাইলে স্বার্থপর হয়ে যাও, আর মানুষের কাছে ভালো হয়ে থাকতে চাইলে নিঃস্বার্থ হও।

-হুমায়ূন আহমেদ