স্মৃতির আয়নায় অতিথ সালিশ-বিচার ও বর্তমান পরিস্থিতি

ফিচার

মোঃ মাইন উদ্দিনঃ
আমাদের দেশে সালিশ-বিচার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারব্যবস্থা। গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সালিশ-বিচার ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত। গ্রাম্যসালিশ বিচারব্যবস্থা আমাদের পূর্ব পুরুষদের আমলেও ছিল আজও তা বহাল আছে। তবে আগের মতো না অনেকটা আধুনিকায়ন হয়েছে বিভিন্ন ভাবে।

আসছি এখন মূল বিষয়েঃ

আমার শ্রদ্বেয় চাচা মরহুম তমিজ উদ্দিন সাহেব কিশোরগঞ্জের ছিলেন কুলিয়ারচর উপজেলার সালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের স্বাধীনতা পরবর্তী দ্বিতীয় চেয়ারম্যান ও অত্র এলাকার একজন গম্যমান্য গ্রাম্য বিচারক। সেই সুবাদে সে সময়ের অন্যন্য জনপ্রতিনিধি, সালিশ-বিচাকগন ও তাঁর বন্ধুরা সময়ক্ষণে প্রায়ই আমাদের বাড়িতে এসে জড়ো হয়ে গল্প-গুজব করতেন এবং অত্যন্ত প্রানোজ্জলভাবে সমাজের সঙ্গতি-অসঙ্গতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন আর মন খুলে হাসতেন। তখন আমি নিতান্ত ছোট হলেও আমার মনে কৌতূহল সৃষ্টি হতো কি কারণে এই সকল তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন সম্মানি ব্যক্তিরা হাসছেন?

আমি একটু আড়ি পেতে যা শুনলাম বা উপলব্ধি করলাম তা হল তাদের দ্বারা মিমাংসিত-অমিমাংসিত সালিশ-বিচারের রায়, বাদী-বিবাদী পক্ষের চিন্তা-চেতনা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রায়ের পরে বিবাদী পক্ষের অভিমত নিয়ে এক একজন এক একজনের অভিজ্ঞতা স্মৃতিচারণ করছেন আর হাসছেন। যদিও বিচার কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে এইভাবে জমানো হাসি প্রকাশ করা কঠিন। সে সময় আমার শ্রদ্বেয় চাচার সাথে যাদেরকে চলাফেরা করতে বা এক সাথে বসে গল্প-গুজব করতে দেখেছি তাদের মধ্যে সালুয়া ইউনিয়নের স্বর্গীয় যোগেশ বর্মন, মধ্য সালুয়া গ্রামের মরহুম কিতাব আলী প্রধান, মরহুম হাছেন আলী মেম্বার, মরহুম সিরাজ মেম্বার, বীর কাশিমনগর গ্রামের মরহুম আরশ চেয়ারম্যান, দড়িগাঁও গ্রামের মরহুম জজ মিয়া, মরহুম মজিদ মেম্বার, মরহুম চন্দু মেম্বার, ভিটিগাঁও গ্রামের মরহুম হাজী মনাফ মিয়া, মরহুম হাজী পছন্দ আলী, উত্তর সালুয়া গ্রামের মরহুম রাশেদুজ্জামান রজব আলী মাস্টার, মরহুম কমরেড হানিফ চেয়ারম্যান, মরহুম হাজী আপ্তাব উদ্দিন মেম্বার, মরহুম খুশিদ মেম্বার, মরহুম রহিম মেম্বার ও দক্ষিণ সালুয়া গ্রামের মরহুম রেয়াজত আলী মেম্বার প্রমুখ।

আমার চাচাসহ উল্লেখিত গুত্বপূর্ণ মানুষগুলো নিজেদের জ্ঞানবুদ্ধি, সমাজকর্ম, রাজনীতি স্ব-স্ব ক্ষেত্রে আলোকিত, আলোচিত ও সর্বজন প্রসংশিত সম্মানি ব্যক্তিত্ব। আমার সেই ছোটবেলায় দেখা সমাজ সংস্কারের জন্য তাদের গ্রাম্য সালিশ-বিচার, বিচারজ্ঞান, বিচার কার্য সম্পাদন, দৃষ্টিভঙ্গি, তীক্ষ্ণবুদ্ধি, জনপ্রিয়তা, সমস্যা সমাধানের এভিলিটি ও তাদের নেতৃত্ব আমাকে প্রায়ই ভাবায় তাদের শুন্যস্থান কি কখনো পূরণ হবে? তাদেরকে টেইক ওভার বা ছাড়িয়ে আরো ভালো কিছু করার প্রত্যয়ে কেউ কি কাজ করছেন? যা আমাদের চোখে পড়ছে! কেউ হয়তো বলবেন করছে, আবার অনেকেই হয়তো বলবে না।

যাক আমি আজ যে বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করতে চাই তা হল অতিথ সালিশ-বিচার, সালিশ-বিচারে সঙ্গতি, অসঙ্গতি ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে। আমার দেখায় বর্তমান সমাজে এখনো আগের চেয়ে অনেক ভালো মানের সালিশ-বিচারক আছেন যারা মানুষ, সমাজ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রত্যেক এলাকায়ই দেশপ্রেমিক, সালিশ-বিচারক, বড় মনের মানুষ আগেও ছিলেন এবং আছেন, যারা নিঃস্বার্থ ভাবে স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের কল্যাণেই আমাদের সামাজিক সম্প্রীতি বন্ধন আজও অটুট আছে। কিন্তু তবুও আজকাল আমরা মানুষের কাজের স্বীকৃতি দিতে গিয়ে বড়ই সমস্যায় পড়ি। আমরা কেউ কাউকে স্বীকৃতি দিতে চাই না। কেন, কারণ কি?

আসলে আমাদের জ্ঞানের পরিধি যেমন কাজের মুল্যায়নও তেমন। আমরা সেই গন্ডির মধ্য থেকে বিশিষ্ট বুদ্বিজীবী, সমাজসেবক, মাতব্বর বা রাজনৈতিক নেতাদের মুল্যায়নের চেষ্টা করি। যার ফলে আমরা আমাদের জ্ঞানের পরিধির সাথে প্রায়ই ধাক্কা খাচ্ছি। আমাদের ন্যূনতম উপলব্ধিটাও নেই যে-কাজের স্বীকৃতি মানুষকে উৎসাহ যোগায়, নতুন কিছু করার প্রেরণা যোগায়, সমাজে একে অন্যের প্রতি ভাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে। যা দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই মামুলি বিষয়টি বোধগম্য হওয়ার জন্য আমাদের সেই নূন্মতম জ্ঞানও আজ বহু মাইল দূরে।সালিশ-বিচার প্রসঙ্গ আসলে এখনো দেখি আমার শ্রদ্ধেয় চাচাকে বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষিত করা হয়, যা প্রায়ই আমার চোখে পড়ে। যাক সে দিকেও আর যাচ্ছি না, আমি যা বলতে চাই তিনি ছিলেন একজন ভালো চাচা, একজন আদর্শ চেয়ারম্যান ও ন্যায় সালিশ-বিচারিক। আমাকে তিনি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন, যা অনুসরণীয়-অনুকরণীয়।

সালিশ-বিচার নিয়ে আমার চাচার মুখে শোনা একটি বিচারের কাহিনী আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। যা মনে পড়লে আজও আমার হাসি পায়। তবে আপনারাও হাসাবেন কি না তা আমি জানিনা। আমার চাচা একদিন উনার দ্বারা ফয়সালাকৃত একটি ছোট সালিশ-বিচারের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমি একটি পারিবারিক সালিশ-বিচারে দুই পক্ষের কথা শুনে তাদেরকে বিভিন্ন ধরণের উদাহরণ-উপমা দিয়ে যখন দেখলাম তাদের মধ্যে রাগ-বিরাগের একটু ভাটা পড়েছে তখন সেই সুযোগে রায় দিয়ে দিব সিদ্ধান্ত নেই এবং রায়ও প্রদান করি। রায়টি ছিল এই রকম যে, দোষী পক্ষকে বলা হলো, আপনি যে অসামাজিক কু-কর্ম করেছেন তার জন্য সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। আল্লাহ যদি আপনাকে ক্ষমা করেন তাহলে আপনি ভাগ্যবান। আর ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সেইজন্য আপনাকে আমাদের সামনে ১০টি জুতার বাড়ি নিজ হাতে নিজ গালে নিতে হবে এবং নগদ ২০০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে নির্যাতিত পক্ষকে এই দুই দণ্ডে আপনি দণ্ডিত। এখন আমার বিচার আপনি মানতেও পারেন আবার নাও মানতে পারেন। সাথে সাথে দণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তি বললেন, চেয়ারম্যান সাহেব আপনার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি আমি আপনার বিচার ও রায় মানি এবং মেনেও নিয়েছি। তবে আমার একটা কথা আছে। আমি বললাম আর কথা না বলাই ভালো। সে বললো- একটি কথা চেয়ারম্যান সাব, আমি অনুমতি দিয়ে বললাম বলেন শুনি, সে বলল চেয়ারম্যান সাব- ‘জুতার বাড়ির পরিমাণটা বাড়িয়ে দিয়ে জরিমানার টাকার পরিমাণটা কি একটু কমানো যায় না?

আসলে সালিশ-বিচার করতে গিয়ে অনেক সময় বিচারকদের এরকম বিভিন্ন ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। কারণ রাগের মাথায় মানুষ অপরাধ করে ফেলে তাঁর মানে এই নয় যে, তারা একেবারে জ্ঞান-বুদ্ধিহীন মানুষ। আজকাল মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি দিনদিন ভারছে, সাথে সাথে পাল্টাচ্ছে বিচারের ধরণ, মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে সচেতনতা।

আসলে সালিশ-বিচার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা করার মত তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আমার নেই এবং আমার জন্য এটা একটা কঠিন কাজ। আপনারা হয়তো ইতিমধ্যেই ভাবছেন শুরু করেছেন যে, এই ভদ্রলোক সাংবাদিক জগতে থেকে ‘সালিশ বিচার’ জগত সম্পর্কে এতটুকু জানে কিভাবে? বলতে গেলে আমি চেয়ারম্যান বাড়ির ছেলে হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে সালিশ-বিচার শব্দটির সাথে সেই ছোটবেলা থেকেই পরিচিত। তাই ভাবলাম এই বিষয়টা নিয়ে একটু পর্যালোচনা করি।
আসলে গ্রাম্য সালিশ-বিচার হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে দেওয়ানি বা ফৌজদারি উভয় ধরনের ছোট-খাট বিবাদ, দাঙ্গা, হাঙ্গামা ফয়সালার অনানুষ্ঠানিক সামাজিক বিচার-ব্যবস্থা।

আর এই বিচার কার্য সমাধান করেন স্থানীয় মাতব্বর, চেয়ারম্যান, মেম্বার ও তাদের সমন্বয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত বিচারক সভা। সালিশ মূলত পাড়া ও গ্রাম ভিত্তিক স্থানীয় লোক সমাজের বিচার-ব্যবস্থা। প্রাচীনকাল থেকে আমাদের পল্লী অঞ্চলে প্রধানত যে দু’ধরনের বিচার-ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, তার একটি হলো সালিশ-বিচার, অপরটি হলো সুনির্দিষ্ট আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা।

রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থা হচ্ছে, যা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, জজ কোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আমাদের দেশের গ্রাম্যসমাজ জীবনে সালিশ-বিচার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সালিশ-বিচার ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত। গ্রাম্য সালিশ ও বিচার ব্যবস্থা আমাদের পূর্ব পুরুষদের আমলেও ছিল আজও তা বহাল আছে। তবে আধুনিকালে এর বিকাশ ঘটছে ভিন্ন ভাবে।

যেমন আগেকার গ্রাম্য সালিশ-বিচার সাধারণত সাদা দাঁড়ি ওয়ালা বয়স্ক মুরব্বীরা করতেন এবং বিচারের আসরে তাদের জন্য রাখা হত পান-সুপারি, বিভিন্ন ধরনের হুক্কা, বিড়ি, সিগারেট প্রভৃতি। সালিশ-বিচারকরা মাঝে মধ্যে হুক্কায় গুড়ুম গুড়ুম টান দিতেন আর বিচার কার্য পরিচালনা করতেন। তাঁরা কথা বলতেন অনেক ভেবে চিন্তে, যুক্তি সম্বলিত। আর আজকালের চিত্রটা একটু ভিন্ন। এখন নাতির বয়সি নবীনরা সালিশ-বিচার করছেন। অনেকে নামের পূর্বে বিশিষ্ট সালিশিয়ন ও বিচারক লিখে নিজের ফোন নাম্বার দিয়ে ভিজিটিং কার্ড তৈরি করে মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন। আর এসব উদ্ভট আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তাঁরা বলে ‘গণতান্ত্রিক দেশে সবার সমান অধিকার’। এদের কারো হাতে স্মার্টফোন, মুখে পান, ডান হাতের ওয়ার্নিং ফিঙ্গারের ডগায় চুন আর সিগারেট তো আছেই! কি বলবে। আবার মাঝে মাধ্যে দেখা যায় সালিশে বসে মোবাইল ফোন রিসিভ করে বলে, আমি একটা জটিল সালিশে আছি, আপনার সালিশের ডেট বদলান। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে এই হচ্ছে সালিশ-বিচারের হাল হকিকত।

কিছুদিন আগে আমার এলাকার একটি সালিশে কতিপয় এক সালিশানের এই ধরনের ভাবভঙ্গি দেখে ও তাঁর কথা শুনে আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা একটি রূপকথা মনে পড়েছিল। আমার সেই বন্ধুটি কোনো অযোগ্যাকে যোগ্যতার আগের কাতারে দেখেই কথায় কথায় বলতো- ‘কিরে ব্যাঙের আবার সর্দিজ্বর’? আসলে বন্ধুর কথাটি বড়ই অর্থবহ কথা। যা আমাদের সমাজ ও গ্রামীণ জীবনে বিপদ সীমার উপর দিয়ে অতিক্রম করছে নিয়ন্ত্রণবিহীন ভাবে। কারণ আমাদের দেশ একটি গ্রাম প্রধান দেশ, এখানে অধিকাংশ লোক গ্রামেই বসবাস করে। তাদের সরল সাদামাটা জীবনযাপনে নানাবিধ সমস্যা দেখা যায়। সেই সমস্যা সমাধানে গ্রাম্য সালিশ-বিচার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গ্রামীণ এই বিচারব্যবস্থা আজ কতিপয় কিছু সালিশানের কারণে গ্রাম-বাংলাড অর্থহীন ও সহজ-সরল, সাধারণ মানুষকে শোষণের অন্যতম হাতিয়ারে পরিনত করেছে। তাদের কারণে সিহংভাগ সালিশ বিচার ন্যায়সঙ্গত হচ্ছেনা এবং এর পেছনে অনেকগুলো
কারণও কাজ করে।

যেমনঃ

আমরা সাধারণত ঘুষ, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, লুটপাট, স্বজনপ্রীতির জন্য দায়ী করি কতিপয় কিছু সরকারি কর্মচারি-কর্মকর্তা, চেয়ারম্যান, মেম্বার, কিছু রাজনৈতিক নেতা ও পাতি নেতাদের। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের এক কালের মহৎ গুণাবলীর অধিকারী সেই ন্যায়ের প্রতীক সালিশ-বিচারক থেকে শুরু করে গ্রাম্য মাতব্বররাও আজকাল বিড়ি, সিগারেট, লাল চা, দুধ চা, থেকে শুরু করে নগদ অর্থ সালিশ-বিচারের ফিস হিসেবে গ্রহণ করে উল্টা-পাল্টা বিচার করছেন। এমনকি ন্যায়কে অন্যায়, আর অন্যায়কে ন্যায়ে পরিণত করাই তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা সমাজে সৃষ্টি করছে অস্থিরতা। আর সমস্যা সমাধানের চেয়ে সমস্যাকে জিইয়ে রেখেই দুইপক্ষের কাছ থেকে স্বার্থ সিদ্ধি হাসিল করতে তাঁরা ব্যস্ত।

বলতে গেলে গ্রাম্যসালিশ-বিচারে নীতি- নৈতিকতায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়ার কারণে সমাজজীবনে আজ হিংসা, বিদ্বেষ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কখনো কখনো বংশ পরস্পরে প্রভাবিত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রতিবন্ধকতা গ্রাম্যসালিশ-বিচারব্যবস্থাকে করেছে প্রশ্নের সম্মুখীন। যেমন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ন্যায়ের পক্ষে লোক না থাকা, ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থান, একদিনের সালিশ বার বার বসা, বংশ প্রীতি বা এলাকা প্রীতি, স্বজনপ্রীতি, সালিশ বসার পূর্বে দুই পক্ষ থেকে টাকা নেয়া, মিথ্যা সাক্ষী, টাকার বিনিময়ে সত্যকে গোপন করা, চূড়ান্ত মিমাংসা না করা, কুচক্রী লোকের কু-পরামর্শ, আইন সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা এবং দেশে যে সরকার ক্ষতায় থাকে সেই সরকারের প্রতিনিধির ক্ষমতার দাপটে প্রতিপক্ষ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হওয় ছাড়াও সাধারণ বিষয় নিয়ে সংগঠিত সালিশ-বিচারে আওয়ামী লীগ, বিএনপি’র বিচারকদের উপস্থিতি আবির্ভাব লক্ষণীয়। যা সমস্যা সমাধানের চেয়েও সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। আর এর কারণও একটায়, আজকালের বেশিরভাগ সালিশ বিচারকদের মধ্যে দূরভিক্ষণ যন্ত্র দিয়েও সততা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কিন্তু সৎ লোক যে একেবারে নেই সে কথা আমি বলতে চাই না, বলতে চাই গ্রাম্য সালিশ-বিচার ব্যবস্থায় আপোস নিস্পত্তি করতে পারলে যে কোনো সমস্যার সমাধান উভয় পক্ষের জন্যই কল্যাণ হয়। কারণ তা না হলে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় আদালতে গিয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করেও কোনো সুরাহা তো হয়নাই বরং ঘাটে ঘাটে সেলামি দিতে দিতে দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনৈতিকভাবে। তাই বলছি এখনো আছে কিছু সৎ, খোদা ভীরু লোক এবং যোগ্য বিচারক, যাদের কারণে গ্রাম্যসালিশ-বিচারের মাধ্যমে যে কোনো ঘটনা আপোস মিমাংসা করে উভয় পক্ষই বিচার পেয়ে ঘরে ফিরেন।

কিন্তু আজকাল তো দেখছি আমাদের গ্রামীণ, সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা যতটা না ভয়ানক এর চেয়ে বেশি ভয়ানক আমাদের মন মেজাজ, অহংকার, অস্তিত্বের লড়াইয় ও লোভ-লালসা ইত্যাদিতে। তাই বলছি আগে আসুন আমাদের মনটাকে পরিস্কার করি, সমস্যার সমাধান তো হবেই ইনশাআল্লাহ। আর যদি বিচার মানি ‘তাল গাছ আমার’ বা আমি যার পক্ষ হয়ে সালিশ-বিচারে এসেছি তার- এই যে একটা ইগু স্বভাব তা থেকে উত্তরণ ঘটানো দরকার।
আজ আর না লিখে এখনেই আলোচনার পরিসমাপ্তি ঘটাতে হবে। কেননা অনানুষ্ঠানিকভাবে অনেক অগোছালো আলোচনা-সমালোচনা করে ফেলেছি, যা কথার কথা বলতেই হয়। না বলে অহেতুক সমস্য নিয়ে শুধু শুধু চায়ের দোকানে বসে আলোচনা-সমালোচনা করতে করতে মুখে ফেনা তুলে কি লাভ। তবে আশা করি সমস্যা থেকে কিভাবে উত্তরণ ঘটানাো যায় তা নিয়ে আজকের আলোচনা-সমালোচনা, নতুন চিন্তা, চেতনা ও ভাবনা হতে পারে বর্তমান সমাজ উন্নয়নে সবার জন্য দিক নির্দেশনা।

আর সর্বশেষ কথা হল, বর্তমান সালিশ-বিচারিকদের মাঝও হাতে গোনা কিছু লোক এখনও আছে, যারা সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা বজায় রেখে চলছেন নিতান্ত কষ্ট ত্যাগ স্বীকার করে। তবে আমার দেখা আগের মতো সৎ সালিশ-বিচারক সংখ্যক স্বল্প হলেও আছেন, তাঁরা হক কথা বলেই যাচ্ছেন। কিন্তু ভেজালের ভিড়ে তাঁরা নিতান্ত কোণঠাসা বলেই মনে হয়।

লেখক, সংবাদিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *