২১, নভেম্বর, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

শেখ হাসিনা: একজন নেতা দেশকে যেখানে নিয়ে গেছেন

আপডেট: October 7, 2019

শেখ হাসিনা: একজন নেতা দেশকে যেখানে নিয়ে গেছেন

শেখ হাসিনা দিল্লি পৌঁছানোর দুই দিন আগেই সেখানে ছিলাম। এই দুই দিন বিভিন্ন ক্লাবে, ব্যবসায়িক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অফিসেই নানান কাজে যেতে হয়। ব্যবসায়িক বলতে ব্যবসার পলিসি নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের সঙ্গেই কথা হয় বেশি। শিল্পপতিও কয়েক ব্যক্তি। আবার তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে যারা ব্যবসা করছেন, এমন লোকজনও আছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে একটা বিষয় বোঝা যায়, তারা মনে করছেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আরো দশ বছর চললে, সাউথ ইস্ট এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির কোনও পার্থক্য থাকবে না। আবার ভারতীয় ব্যবসায়ীরা যে বিশাল বিনিয়োগ করেন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশগুলোতে, সে বিনিয়োগের কিছু অংশ নিয়েও তারা এখন ভিন্ন চিন্তা করছেন। তারা জানেন, আফ্রিকার দেশগুলো আগামীতে এশিয়ার দেশগুলোর মতোই অর্থনৈতিক উন্নতি করবে। সেজন্য আফ্রিকা তাদের অনেক আগ্রহের এলাকা। তারপরেও তারা এখন মনে করছেন, কিছু কিছু টেকনোলজি নিয়ে তাদের এখন বাংলাদেশে প্রবেশ করা দরকার। কারণ, বাংলাদেশের গ্রোথ ও অগ্রগতি অবিশ্বাস্য গতিতে যেমন চলছে, তেমনি বাংলাদেশ তাদের কাছে হওয়ায় বিনিয়োগে লাভবান হওয়া সম্ভব। তারা এসব বিনিয়োগ ও ব্যবসার হিসাব করছে শেখ হাসিনা দেশকে আরও দশ বছর নেতৃত্ব দেবেন এবং আজীবন দেশকে লি কুয়ানের মতো পরামর্শ দেবেন এমন একটি হিসাব করে।

ব্যবসায়ীদের মতো সরকারের নীতি বাস্তবায়নকারী ও নীতি প্রণয়নকারীদের বক্তব্য এমন, ভারত এর আগে কখনই এমন কোনও বন্ধু প্রতিবেশী পায়নি যে তার অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগী হতে পারে। তারা সবাই জানেন, বাংলাদেশ শিগগিরই উন্নয়নের দিক থেকে ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে। কারণ, ভারতের অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে। বৃহৎ দেশ, বৈচিত্র্যময় বৃহৎ জনগোষ্ঠী, নৃগোষ্ঠীগত চরিত্রের নানান ধরন, শিক্ষার হার কম, কুসংস্কারসহ নানান সমস্যা সেখানে রয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ একক নৃগোষ্ঠীর, এক ভাষার একটি দেশ। যেখানে যেকোনও বিষয়েই দ্রুত ঐক্য সম্ভব। তবে তারপরেও ভারতের এসব নীতিনির্ধাকরা মনে করেন, ভারত সেইভাবেই কাজ করে যাবে, যাতে বাংলাদেশ কোনোরূপ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটে না ভোগে। এক্ষেত্রে দুই দেশ যাতে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে, সেই পথ তারা সৃষ্টি করতে চান। তাদের বক্তব্য হলো, বাংলাদেশের উন্নয়নে এখন একমাত্র শত্রু জঙ্গিবাদ। কোনোক্রমেই যেন দেশটিতে আর জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য দুই দেশের ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার পক্ষে তারা।

যেমন—রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে তারা প্রথমে খুবই একটা গুরুত্ব দেয়নি। তারা শুধু সেটাই লক্ষ রেখেছিল, যাতে রোহিঙ্গারা তাদের দেশের ভেতর প্রবেশ করতে না পারে। কিন্তু এখন তাদের উপলব্ধি ভিন্ন। রোহিঙ্গা শিবিরকে কেন্দ্র করে যাতে কোনোরূপ জঙ্গির আস্তানা গড়ে ওঠে, সে বিষয়টি নিয়ে তারা সজাগ। আর এক্ষেত্রে তারা বিশ্বাস করে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব। তারা মনে করে একমাত্র শেখ হাসিনার নেতৃত্বই জঙ্গিবাদ দমন করতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামী নেতাদের শেখ হাসিনা যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সাজা দিয়েছেন, সেটা কেবল শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব। এখন আবার নতুন করে জামায়াতে ইসলামী নেতাদের ছেলেমেয়েরা যে রোহিঙ্গাসহ নানান কিছু ঘিরে জড়ো হতে চলেছে, এটাও দমন করতে পারবেন একমাত্র শেখ হাসিনা। জামায়াতে ইসলামী নেতাদের সন্তানদের ঘন ঘন চট্টগ্রাম যাতায়াত সম্পর্কে তারা সজাগ।

শিল্পপতি, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কথা সব সময়ই সীমিত পর্যায়ে থাকে। কিন্তু ক্লাবগুলোতে শেখ হাসিনাকে নিয়ে আলোচনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নমাত্রার উচ্ছ্বাসে। যেমন—একটি ক্লাবে আলোচনার সময়ে একজন গবেষক বললেন, নেতা হিসেবে এ মুহূর্তে এশিয়ায় শেখ হাসিনার সমকক্ষ কেউ নেই। এমনকি তিনি একথাও বললেন, তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ব ইতিহাসের আইকন, তবে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনা এখন এশিয়ার ইতিহাসে আইকন।

দুই দিনের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে শেখ হাসিনা ছিলেন মূল আকর্ষণ। আবার শেখ হাসিনার ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এই সম্মেলনে যোগ দেওয়ায় অনেক খুশি ভারতীয় শিল্পপতিরা। তাদের ভেতর মাঝে মাঝে একটা সংশয় কাজ করতো, চীনের শিল্পপতিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা বাংলাদেশে টিকে থাকতে পারবে কিনা? কিন্তু শেখ হাসিনার মুখ দিয়ে তার ভারসাম্যপূর্ণ কথা শুনে সর্বোপরি ভারতের জন্য স্পেশাল ইকোনমি জোন থাকায় তারা এখন অনেক বেশি নিশ্চিত। তবে তারা প্রশংসা করলেন, শেখ হাসিনা যে এশিয়ার প্রায় সব দেশের জন্য স্পেশাল ইকোনমি জোন করে দিয়েছেন, এ কাজের। তাদের মতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়ে শেখ হাসিনার কাছ থেকে এখন ভারতের অনেক কিছু শেখার আছে। এই শেখার বিষয় বলতে গিয়ে একজন তরুণ বামপন্থী নেতা বললেন, বর্তমান মুহূর্তে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বজায় রেখে কীভাবে বাজার অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া যায়, এটা শেখ হাসিনার কাছ থেকে এখন ভারতের প্রগতিশীল রাজনীতিকদের শেখা উচিত।

অন্য একটা লেখায় লিখেছি, তাই এখানে পুনরুক্তি করতে চাই না ওই অর্থে শেখ হাসিনার এটা দ্বিপাক্ষিক সফরটা মূল ছিল না, বস্তুত সফরটির ফোকাল পয়েন্ট ছিল অর্থনৈতিক সম্মেলনে যোগ দেওয়া। তবে ভারতের পীড়াপীড়িতে শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত একটি দিন ভারত সফরের জন্য ব্যয় করেন। সেখানে কিছু এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর হয়েছে। সে বিষয়ে আলোচনা এ লেখায় নয়। পরবর্তী লেখায় লিখব বলে আশা রাখি।

এই লেখা শেষ করতে চাই আরেকটি ঘটনাকে উল্লেখ করে। এরশাদের ভারত সফর, খালেদা জিয়ার ভারত সফর ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার ভারত সফর লক্ষ করার সুযোগ হয়েছে। এরশাদ বা খালেদা ভারত সফর করার সময় দেখেছি ভারতের মূল ধারার পত্রিকা যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া, হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য হিন্দু এসব পত্রিকার ভেতরের পাতায় খুব ছোট করে এ খবর ছাপা হতো। অথচ শেখ হাসিনা যেদিন দিল্লিতে পৌঁছান, তার পরের দিনের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে ছবিসহ প্রথম পাতায় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তার পৌঁছানোর খবর ছাপা হয়। আর ছয় তারিখে টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য হিন্দু সব কাগজের লিড নিউজ ছিল শেখ হাসিনার ছবিসহ নিউজ।

ভেতরের পাতা থেকে লিড নিউজে দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন শেখ হাসিনা। এই অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশকে পৌঁছে দিতে পেরেছেন শেখ হাসিনা তার অনেক সাফল্যের ভেতর দিয়ে। প্রথমত অর্থনৈতিক উন্নয়নে তিনি দেশকে সারা বিশ্বের একটি বিস্ময়ে পরিণত করেছেন। তারপরে, জঙ্গি দমন, অসাম্প্রদায়িক আধুনিক চেতনায় দেশকে প্রবাহিত করা। সর্বোপরি বর্তমানের এই বহুকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের বিশ্বে তিনি সবার সঙ্গে সমান বন্ধুত্ব রেখে, সবার হাত ধরে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছেন। পৃথিবীর খুব কম নেতাই একাজ করতে পেরেছেন। আর তারই ফল আজ উপমহাদেশের সব থেকে বড় মিডিয়া হাবে শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ লিড নিউজ। আর তার নেতৃত্বে দেশ এগোলে, বিশ্ব মিডিয়া হাবে তিনিই হবেন সব থেকে বড় আকর্ষণ। বাস্তবে আমাদের দেশের আয়তন তাই যাই হোক না কেন, শেখ হাসিনা তার নেতৃত্বের গুণে আমাদের আকৃতি অনেক বিশাল মাপের করে দিয়েছেন।

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক