নুসরাত ধোয়া তুলসী পাতা না, এমন কটূক্তির অভিযোগে যা বললেন সেই অধ্যক্ষ

জাতীয়

আগুনে পুড়িয়ে হত্যার শিকার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে নিয়ে কটূক্তি করায় বিচারের দাবি উঠেছে ফেনী সরকারি জিয়া মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ তাহমিনা বেগমের। তবে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ।

নুসরাতকে নিয়ে অধ্যক্ষ তাহমিনা কটূক্তি করেছেন- এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি তাদের।

জানা গেছে, ১৩ এপ্রিল শনিবার সকালে নুসরাতের হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধনের অনুমতি চেয়ে অধ্যক্ষের কাছে যান সেখানকার শিক্ষার্থীরা।

তিনি মানববন্ধনের অনুমতি না দিয়ে নুসরাতকে নিয়ে সমালোচনা শুরু করেন। অধ্যক্ষের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই দিনই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে তাহমিনা রুমি ও স্নিগ্ধা জাহান রিতা নামে দুই ছাত্রী।

তারা স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “নুসরাত হত্যার বিচার দাবিতে ফেনী সরকারি জিয়া মহিলা কলেজের ব্যানারে আমরা একটা মানববন্ধন করতে কলেজের অধ্যক্ষ তাহমিনা বেগমের কাছে শনিবার সকাল ৯টায় অনুমতির জন্য গিয়েছিলাম। আমরা কয়েকজন ম্যাডামের রুমে যাই। তারপর ম্যাডাম যা বললেন তা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমরা কেউই।”

“ম্যাডাম আমাদের বললেন, নুসরাতকে তার স্যার বলেছিল পরীক্ষার আগে প্রশ্ন দেবে, তাই নুসরাত নিজ ইচ্ছায় স্যারের কাছে গিয়েছিল। অথচ এতদিন ধরে আমরা জেনে আসছি কলেজের পিয়নকে দিয়ে নুসরাতকে ডাকা হয়েছে। তবে কি আমরা এতদিন ভুল জানতাম? আমাদের কাছে ভুল তথ্য দিয়েছে মিডিয়া? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে ইচ্ছা হয় আমার। কে দেবে এসব প্রশ্নের উত্তর? কোথায় পাব এসবের উত্তর?”

“আমাদের ম্যাডাম আরও বলেছেন, অতীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। বর্তমানে ঘটছে, কারণ বর্তমান মেয়েরা অনেক লোভী। নুসরাত মেয়েটা ধোয়া তুলসী পাতা না। মেয়েটার সঙ্গে যেটা হয়েছে তার জন্য মেয়েটাই দায়ী। এটার জন্য মানববন্ধন করতে আমি কখনো অনুমতি দেব না। তোমরা ক্লাসে যাও।”

এদিকে নুসরাতকে নিয়ে অধ্যক্ষের কটূক্তির বিষয়টি জানাজানি হলে প্রতিবাদ ও অধ্যক্ষের বিচারের দাবি শুরু হয়। অধ্যক্ষ তাহসিনা বেগমের বিরুদ্ধের শিক্ষার্থীদের নানা অভিযোগ প্রকাশ্যে। অন্যান্য কর্মসূচিসহ কলেজ অভ্যন্তরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশালীন ও রূঢ় ব্যবহার করেন বলেও একাধিক শিক্ষার্থী জানান।

ফেনীর স্বেচ্ছাসেবী ও নারী অধিকার কর্মী মঞ্জিলা আক্তার মিমি বলেন, “অধ্যক্ষের এমন আচরণে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। তিনি একজন নারী হয়ে কিভাবে একজন নারীকে নিয়ে এমন কটূক্তি করতে পারেন। নুসরাতের বিষয়ে যেখানে সবাই প্রতিবাদ করছে, সেখানে তার বাধা দেওয়া কোনো যৌক্তিকতা নেই।”

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম নান্টু বলেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে যেখানে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ মহলের তৎপর রয়েছে সেখানে রাষ্ট্রের একজন কর্মচারী হয়ে এমন মন্তব্য ধৃষ্টতা।

তিনি বলেন, আন্দোলন-প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের অধিকার। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে দায়িত্ব বহির্ভূত এমন মন্তব্য শোভা পায় না।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একজন অধ্যক্ষ হয়ে আরেক অধ্যক্ষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ ঘটনা তার পদত্যাগ উচিত বলে বলে মনে করেন তিনি।

ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আরিফুল আমিন রিজভী বলেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের ফলে গণবিস্ফোরণ সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছে, সেখানে তিনি (অধ্যক্ষ) এত দুঃসাহস পান কোথায়!

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ফেনী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বিকম বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। যদি অধ্যক্ষ এমন মন্তব্য করে থাকেন তবে তিনি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে তিনি ঠিক এমন কথা বলেছেন কিনা সেটা দেখার বিষয়।

এখনতো তিলকে তাল বানানো হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সকালে জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনিও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ তাহমিনা বেগম বলেন, শিক্ষার্থীদের এ অভিযোগ সত্য নয়। আমি তাদের বলেছি- বিষটি প্রধানমন্ত্রী দেখছেন। এখন মানববন্ধন করার কোনো প্রয়োজন নেই।

নুসরাতের বিরুদ্ধের কটূক্তি করেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ধরনের কোনো কটূক্তি আমি করিনি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *